ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যেতে লাগতে পারে মাত্র ৫ ঘণ্টা!
ভাঙ্গা–বরিশাল–পটুয়াখালী–কুয়াকাটা ৬ লেনের মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা, ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ১২৫ কোটি টাকা
Ourtime 24 Online News | বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকা: পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এবার ভাঙ্গা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী হয়ে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থনীতি ও পর্যটনশিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রস্তাবিত এই মহাসড়ক প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাতায়াতের সময় বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পাঁচ ঘণ্টায় যাতায়াতের বিষয়টি নির্ভর করবে প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, সড়কের অবস্থা, যানজট এবং বাস্তবায়ন-পরবর্তী পরিচালনব্যবস্থার ওপর।
পদ্মা সেতুর পরও কেন ভোগান্তি?
পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। প্রায় ৫৫ কিলোমিটার এই পথ অনুকূল পরিস্থিতিতে প্রায় ৫৫ মিনিটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব।
কিন্তু ভাঙ্গা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কপথে এখনো বিভিন্ন স্থানে যানজট, সড়কের সীমিত প্রশস্ততা এবং ধীরগতির যানবাহনের কারণে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় ৩১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে বর্তমানে সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। এর মধ্যে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় ২৩৬ কিলোমিটার পথে ব্যয় হয় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা।
ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—ভাঙ্গা–বরিশাল–পটুয়াখালী–কুয়াকাটা মহাসড়ককে আধুনিক, প্রশস্ত ও নিরাপদ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নীত করা।
৩৩ হাজার ১২৫ কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প
প্রস্তাবিত ছয় লেনের মহাসড়ক প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি প্রণয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ৩৩ হাজার ১২৫ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যাতায়াতের সময় কমানো, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস এবং বাণিজ্যিক পরিবহনব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা।
তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থায়ন, ভূমি অধিগ্রহণ, দরপত্র এবং নির্মাণকাজ শুরুর সময় সম্পর্কে সর্বশেষ সরকারি তথ্য যাচাই করা জরুরি।
২০২৮ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু হবে?
প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭–২৮ অর্থবছরে নির্মাণকাজ শুরুর একটি লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
- প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
- ভূমি অধিগ্রহণ ও জমি হস্তান্তর সম্পন্ন করা।
- বিস্তারিত নকশা ও কারিগরি প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা।
- দরপত্র আহ্বান ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন।
এসব প্রক্রিয়া সময়মতো সম্পন্ন হলে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শুরুর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সরকারি চূড়ান্ত ঘোষণা ছাড়া নির্দিষ্ট সময়সীমাকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
পাঁচ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে কুয়াকাটা—কতটা বাস্তবসম্মত?
ছয় লেনের আধুনিক মহাসড়ক নির্মিত হলে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। উন্নত সড়ক, পরিকল্পিত প্রবেশ ও বহির্গমন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সার্ভিস রোড এবং যানবাহনের সুশৃঙ্খল চলাচল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে শুধু সড়কের লেন সংখ্যা বাড়ালেই যাতায়াতের সময় নির্দিষ্টভাবে পাঁচ ঘণ্টায় নেমে আসবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সড়কের নকশা, গতি নিয়ন্ত্রণ, যানজট, বিরতি এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতিও সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
তারপরও আধুনিক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত আরও দ্রুত, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পায়রা বন্দর থেকে কুয়াকাটা: অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা
ভাঙ্গা–বরিশাল–পটুয়াখালী–কুয়াকাটা করিডোর শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ও পর্যটন খাতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
১. পায়রা বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম
উন্নত সড়ক যোগাযোগ পায়রা বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাত উপকৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
২. কুয়াকাটা পর্যটনের বিকাশ
কুয়াকাটা বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় সমুদ্রসৈকত। ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে যাতায়াত সহজ হলে পর্যটকদের ভ্রমণ আগ্রহ বাড়তে পারে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়।
৩. কৃষি ও মৎস্যপণ্য পরিবহন
দক্ষিণাঞ্চল কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ। উন্নত সড়ক যোগাযোগের ফলে মাছ, তরমুজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়তে পারে। তবে পচনশীল পণ্য পরিবহনে প্রকৃত সময় ও ব্যয় সাশ্রয় নির্ভর করবে সরবরাহব্যবস্থা, সংরক্ষণ সুবিধা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর।
৪. কর্মসংস্থান সৃষ্টি
সড়ক নির্মাণের সময় প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন, আবাসন, পরিবহন, ব্যবসা ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শুধু এই মহাসড়ক নয়, আরও যেসব সড়কের উন্নয়ন জরুরি
দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মহাসড়কের উন্নয়নও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক: শিল্প, পর্যটন ও আন্তজেলা পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই রুটের উন্নয়ন এবং চলমান প্রকল্পগুলোর যথাসময়ে বাস্তবায়ন জরুরি।
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক: দেশের প্রধান বাণিজ্যিক করিডোর হওয়ায় এই রুটে যানজট নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ প্রবেশ ও বহির্গমন এবং সার্ভিস রোডের কার্যকারিতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা–রংপুর মহাসড়ক: উত্তরাঞ্চলের কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য এই সড়কের উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যশোর–বেনাপোল মহাসড়ক: স্থলবন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর করতে এই করিডোরের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
ঢাকা–মাওয়া–ভাঙ্গা সংযোগ সড়ক: পদ্মা সেতুর সুফল দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরও বিস্তৃত এলাকায় পৌঁছে দিতে সংযোগ সড়কগুলোর উন্নয়ন জরুরি।
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত
ভাঙ্গা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
এর সুফল শুধু যাত্রীদের যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি, অনুমোদন, অর্থায়ন এবং নির্মাণ শুরুর সময় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করা জরুরি।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা—আধুনিক, নিরাপদ ও দ্রুতগতির সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠুক, আর পদ্মা সেতুর সুফল পৌঁছে যাক পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রতিটি জনপদে।










মন্তব্য করুন